চাঁদের অদৃশ্য দিক অতিক্রম করে পৃথিবীর পথে ফিরছেন চারজন মানুষ। মানব ইতিহাসে আগে কখনো এত দূরত্বে কেউ যায়নি। আর্টেমিস–২ অভিযানের এই যাত্রা তাই শুধু একটি মহাকাশ অভিযান নয় এটি মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার এক নতুন অধ্যায়।
গত ১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্র থেকে উৎক্ষেপণের পর প্রায় দশ দিনের এই অভিযানে মহাকাশচারীরা পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৭৬০ মাইল দূরে পৌঁছান। এর মাধ্যমে তারা ৫৬ বছর ধরে অটুট থাকা অ্যাপোলো–১৩ অভিযানের দূরত্বের রেকর্ড ভেঙে দেন। চাঁদের যে অংশটি পৃথিবী থেকে দেখা যায় না, সেই অদৃশ্য প্রান্ত ঘুরে আসা এই যাত্রা মানব অনুসন্ধিৎসার এক অসাধারণ নিদর্শন হয়ে উঠেছে।
এই অভিযানে অংশ নেওয়া চার মহাকাশচারী—ভিক্টর গ্লোভার, রিড ওয়াইজম্যান, ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন ভবিষ্যৎ চন্দ্র অভিযানের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। তাদের বাহন ওরিয়ন মহাকাশযান অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত। চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা সরাসরি পর্যবেক্ষণ চালান এবং সেই তথ্য পৃথিবীতে থাকা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে ভাগাভাগি করেন, যা প্রচলিত স্যাটেলাইট নির্ভর গবেষণার বাইরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
প্রযুক্তির এই সাফল্যের মাঝেও মানবিক অনুভূতি ছিল প্রবল। মহাকাশের দূরত্ব পেরিয়েও তারা পরিবারের সঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে কথা বলার সুযোগ পান, যেখানে হাসি, কান্না, আবেগ ভালোবাসার মিশ্রণ ফুটে ওঠে। এক আবেগঘন মুহূর্তে জেরেমি হ্যানসেন প্রস্তাব দেন, তার সহযাত্রী রিড ওয়াইজম্যানের প্রয়াত স্ত্রী ক্যারলের নামে চাঁদের একটি গহ্বরের নামকরণ করার। ২০২০ সালে ক্যান্সারে মারা যাওয়া ক্যারলের স্মৃতিতে এই প্রস্তাব পুরো অভিযাত্রাকে আরও গভীর মানবিক মাত্রা দেয়।
ওয়াইজম্যান জানান, উৎক্ষেপণের আগে কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময়ই সহযাত্রীরা এই প্রস্তাব নিয়ে তার কাছে এসেছিলেন এবং তা তার জন্য অত্যন্ত আবেগঘন ছিল।
এই অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে নাসা-এর নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিজ্ঞানীরা মহাকাশচারীদের পাঠানো সরাসরি ও রেকর্ডকৃত পাঠানো বার্তা পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের চোখে সরাসরি দেখা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে পাওয়া তথ্য সৌরজগতের গঠন রহস্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নভোচারী ক্রিস্টিনার মতে, এই মিশন বৃহত্তর আর্টেমিস কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য শুধু চাঁদে ফিরে যাওয়া নয়, বরং সেখানে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করা। পরবর্তী আর্টেমিস-৩ মিশনে মহাকাশযানের ডকিং পরীক্ষা চালানো হবে, যা নাসা পরবর্তী মিশনগুলোতে নভোচারীদের চাঁদে নামাতে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। আর ২০২৮ সালের লক্ষ নিয়ে আর্টেমিস-৪ মিশনে মানুষকে আবার চাঁদের মাটিতে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে যা ১৯৭২ সালের অ্যাপোলো-১৭ মিশনের পর প্রথম হবে।
আর্টেমিস ২ কার্যক্রমের এই দশদিনের অভিযাত্রার শেষে এখন তাদের সামনে সবচেয়ে কঠিন ধাপ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ। ঘণ্টায় প্রায় ২৩ হাজার ৮৩৯ মাইল গতিতে প্রবেশের সময় মহাকাশযানটি পরিণত হবে এক জ্বলন্ত অগ্নিগোলকে। এই সময় বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে প্রচণ্ড ঘর্ষণে সৃষ্ট তাপ সহ্য করার দায়িত্ব ওরিয়নের তাপরোধী আবরণ তথা হিটশিল্ড-এর ওপর।
সবকিছু ঠিক থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া উপকূলে প্রশান্ত মহাসাগরে শুক্রবার রাত ৮টায় (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় অনুযায়ী) মহাকাশযানটি সমুদ্রে অবতরণ করবে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী এটি শনিবার সকাল প্রায় ৬টা। অবতরণের পর নাসা ও মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ উদ্ধারকারী দল সমুদ্র থেকে ক্যাপসুল এবং চারজন নভোচারীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। এই অবতরণের মধ্য দিয়েই শেষ হবে প্রায় দশ দিনের এই ঐতিহাসিক অভিযান, যা ভবিষ্যতের বৃহত্তর মহাকাশ অভিযানের পথকে আরও সুগম করে তুলবে।






















































