ড. মাহরুফ চৌধুরী –যে কোন জাতির মাঝে এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয় বরং সময়ের বিবেক, সামাজিক রূপান্তরের প্রতীক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নৈতিক দিকনির্দেশক হিসেবে ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেন। তাঁরা কোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার বহন করেন না, আবার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও তাঁদের শক্তির উৎস নয়; তাঁদের শক্তি আসে সত্যনিষ্ঠ অবস্থান, নৈতিক দৃঢ়তা ও জনমানুষের সঙ্গে একাত্মতা থেকে।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খ্রীস্টপূর্ব) রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের সামনে আপসহীন হয়ে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা (১৯১৮-২০১৩) কারাগারের অন্ধকারে থেকেও বৈষম্যের বিরুদ্ধে নৈতিক আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন, আর মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সমালোচক নোম চম্স্কি (১৯২৮-) ক্ষমতার কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বের বিরুদ্ধে নিরন্তর সত্য উচ্চারণ করে গেছেন।
এঁদের সবার মধ্যেই একটি মিল হলো ক্ষমতার নিকটবর্তী না হয়েও তাঁরা ছিলেন মানুষের নিকটবর্তী, আর শাসক ও শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে তাঁরা দেখেছেন নৈতিক কর্তব্য হিসেবে। শরীফ ওসমান হাদী সেই ঐতিহাসিক ধারারই বাংলাদেশের এক সমকালীন প্রতিনিধি, যিনি প্রতিবাদকে কেবল রাজনৈতিক কৌশল বা দলীয় অবস্থান হিসেবে নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিক দায় হিসেবে ধারণ করেছিলেন।
হাদীর রাজনীতি ছিল সুবিধাবাদের বিপরীতে দাঁড়ানো এক নৈতিক প্রত্যয়; যেখানে অন্যায়কে চিহ্নিত করা যেমন জরুরি, তেমনি তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ছিল অবধারিত কর্তব্য। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, রাষ্ট্র ও সমাজ কেবল আইন, প্রশাসন কিংবা শক্তির ভারসাম্যে পরিচালিত হয় না, সেগুলোর প্রাণশক্তি নিহিত থাকে নাগরিক বিবেক, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার চর্চায়। এই অর্থে ওসমান হাদীর উপস্থিতি ছিল গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ের জন্য এক সতর্ক সংকেত এবং ভবিষ্যতের জন্য এক নৈতিক মানদণ্ড।
যে মানদন্ড আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে: আমরা কোন ধরণের বা কেমন রাষ্ট্র চাই? আর সেই রাষ্ট্র গঠনে আমাদের নৈতিক অবস্থান কোথায়? তাঁর বক্তৃতা ও সামাজিক–রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল কাগুজে শ্লোগানের সীমা অতিক্রম করে গড়ে ওঠা বাস্তবে এক জীবন্ত নৈতিক অনুশীলন। তিনি যে ভাষায় কথা বলেছেন, তা শুধু মঞ্চের উত্তেজনা বা মুহূর্তের আবেগে আবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল তাঁর গভীর চিন্তা, সুস্পষ্ট উপলব্ধি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার ধারাবাহিক প্রকাশ।
দর্শনের ভাষায় বললে, তিনি ‘ন্যায়’-কে কোনো বিমূর্ত নৈতিক আদর্শ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং একে বাস্তব জীবনের কর্মসূচি, সামাজিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ও কর্মে ন্যায় ছিল এমন এক চর্চা, যা প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, প্রতিবাদ ও ঝুঁকি নেওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেছে।
এই অবস্থান মার্কিন দার্শনিক ও নীতিশাস্ত্রবিদ জন রলসের (১৯২১-২০০২) ন্যায়বিচার তত্ত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সঙ্গতিপূর্ণ যেখানে ন্যায় মানে কেবল আইনগত সাম্য নয়, বরং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের স্বার্থ রক্ষার নৈতিক অঙ্গীকার। একইভাবে জার্মান বংশোদ্ভুত মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক হান্না আরেন্ট (১৯০৬-১৯৭৫) যে ‘নৈতিক সাহস’-এর কথা বলেছেন যা ক্ষমতার চাপ, সামাজিক ভীতি ও সংখ্যাগরিষ্ঠের নীরবতার মুখেও সত্য উচ্চারণের সাহস, ওসমান হাদীর জীবন ও রাজনীতিতে তারই এক বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যে, ক্ষমতার সঙ্গে আপস করা নাগরিকত্বের গুণ নয়; বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার অধিকার ও সাহসই নাগরিকত্বের মৌলিক শর্ত। তাই হাদীর কাছে দেশপ্রেম কোনো আবেগতাড়িত শ্লোগান বা প্রতীকী আনুগত্য ছিল না; ছিল দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও কর্তব্যনিষ্ঠার কঠিন পথচলা।
তিনি স্পষ্ট করে বুঝিয়েছেন, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা এক ধরনের সহযোগিতায় রূপ নেয়, সেখানে নৈতিক মানুষ নীরব থাকতে পারে না। সেই কারণেই তিনি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক স্বস্তি কিংবা জনপ্রিয়তার হিসাব না কষে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। জাতীয় জীবনে তিনি উচ্চকিত হয়েছেন কণ্ঠহীনদের কণ্ঠস্বর হয়ে যাঁদের বঞ্চনা ও যন্ত্রণার কথা ক্ষমতার করিডরে পৌঁছায় না। এই ভূমিকার মধ্য দিয়েই হাদী নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন কেবল একজন আন্দোলনকারী হিসেবে নয়, বরং গণমানুষের নৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে; কন্ঠহীনের কন্ঠস্বর হিসেবে।
ইতিহাস আমাদের বারবার শেখায় যে, সত্যের পথে থাকা মানুষগুলো প্রায়ই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, কিন্তু সময়ের গতিপথ বদলে দেওয়ার কাজটিও করেন তাঁরাই। সক্রেটিসের (৪৭০-৩৯৯ খ্রীস্টপূর্ব) বিষপান থেকে শুরু করে গ্যালিলিওর (১৫৬৪-১৬৪২) নির্বাসন, কিংবা ম্যান্ডেলার (১৯১৮-২০১৩) দীর্ঘ কারাবাস সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্ষমতার আরামদায়ক সান্নিধ্য নয়, বরং একাকিত্বের মধ্য দিয়েই সত্য নিজের শক্তি অর্জন করে।
শরীফ ওসমান হাদী এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা ভালো করেই জানতেন, এবং তাঁর জীবনও সেই সত্যেরই সমকালীন প্রতিফলন। তিনি বুঝতেন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মূল্য আছে, আর সেই মূল্য প্রায়শই দিতে হয় নিঃসঙ্গতা, ঝুঁকি ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। স্বৈরাচারী মানসিকতা, পেশিশক্তিনির্ভর রাজনীতি ও দীর্ঘদিনের সামাজিক কুসংস্কৃতির চাপে যেখানে নীরব থাকাই নিরাপদ ও ‘বুদ্ধিমানের কাজ’ বলে বিবেচিত, সেখানে অন্যায়কে স্পষ্টভাবে অন্যায় বলে চিহ্নিত করার অদম্য সাহসই হয়ে উঠেছিল হাদীর প্রধান পরিচয়। তিনি জানতেন, নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়, নীরবতা আসলে শক্তির পক্ষে দাঁড়ানো।
তাই তিনি চুপ করে থাকেননি; চুপ করে থাকাকে তিনি কখনোই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা হিসেবে গ্রহণ করেননি। তাঁর এই সাহসিকতা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বহু মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয় ও নীরবতা ভেঙে দিয়েছে, নাগরিক প্রতিবাদের নতুন কালচারাল ধারা, ভাষা ও নৈতিক অভিধান তৈরি করেছে।
নতুন প্রজন্মের আজাদীর আকাঙ্ক্ষা যে বিচ্ছিন্ন দীর্ঘশ্বাস হয়ে সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, হাদী সেই বিচ্ছিন্ন সুরগুলোকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সেই মুক্তির সুর তিনি একক উচ্চারণে থামিয়ে রাখেননি; বরং তাকে সমবেত সঙ্গীতের সুরের শক্তিতে রূপ দিয়েছেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মাধ্যমে। তাঁর নেতৃত্বে এখানে প্রতিবাদ ছিল শুধু স্লোগান নয়, ছিল সংগঠিত নৈতিক অবস্থান যেখানে তরুণদের স্বপ্ন, ক্ষোভ ও দায়বদ্ধতা একত্রিত হয়ে এক অর্কেস্ট্রার মতো ধ্বনিত হয়েছে।
এই অর্থে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ ছিল হাদীর কণ্ঠের সম্প্রসারণ, আর হাদী ছিলেন সেই কণ্ঠস্বর, যা নতুন প্রজন্মকে বলেছিল ভয় নয়, ন্যায়ই ভবিষ্যতের একমাত্র ভাষা যা আমাদেরকে একটি ইনসাফের রাষ্ট্র উপহার দেবে। হাদীর এই অবস্থান ছিল সচেতন ও নৈতিকভাবে দৃঢ়। তিনি বুঝেছিলেন, যে সমাজে অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, সেখানে প্রতিবাদই একমাত্র অস্বাভাবিক কিন্তু প্রয়োজনীয় কর্ম। সেই কারণেই তিনি ভয়কে অজুহাত বানাননি, সংখ্যাগরিষ্ঠের নীরবতাকে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করাননি। বরং ঝুঁকি জেনেই তিনি কথা বলেছেন, কারণ তাঁর কাছে ন্যায়বোধ ছিল সুবিধার ঊর্ধ্বে।
এই সাহসিকতা কেবল ব্যক্তিগত প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা বহু মানুষের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভয়, সংশয় ও আত্মদমনকে ভেঙে দিয়েছে। তার প্রভাবে নাগরিক প্রতিবাদ পেয়েছে নতুন ভাষা, নতুন ভঙ্গি এবং নতুন নৈতিক অভিধান। মানুষ শিখতে শুরু করেছে প্রতিবাদ মানে বিশৃঙ্খলা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল সুদৃঢ় অবস্থান। গণমানুষের বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির এই পরিবর্তনই হাদীর সবচেয়ে বড় অবদান।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, একজন মানুষের স্পষ্ট ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর কীভাবে মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে আর সমাজ নামক ‘অচলায়তন’-এর নীরব দেয়ালে ফাটল ধরাতে পারে। সেই ফাটল দিয়েই আলো প্রবেশ করে, আর সেই আলোই ধীরে ধীরে একটি সমাজকে নিজের অন্যায়কে প্রশ্ন করার সাহস জোগায়।
যখন ওসমান হাদীকে হত্যা করতে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, তখন তা কেবল একজন মানুষের শরীরের ওপর আঘাত ছিল না; সেটি ছিল ন্যায়, সত্য ও গণতান্ত্রিক চেতনার ওপর আগ্রাসী শক্তির এক সুতীব্র ও প্রতীকী আঘাত। এই সহিংসতা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে কণ্ঠস্বর অন্যায়কে প্রশ্ন করে, যে মানুষ ক্ষমতার স্বাভাবিকীকৃত নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাকে নিশ্চিহ্ন করাই স্বৈরাচারী মানসিকতার চূড়ান্ত লক্ষ্য। এখানে বন্দুকের গুলি কেবল দুর্বৃত্তের অস্ত্র নয়; সেটা ছিল এগিয়ে আসা প্রতিবাদী কন্ঠগুলোর মাঝে ভয় উৎপাদনের একটি কৌশল, যাতে সমাজ আবার নীরবতায় ফিরে যায়।
ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে দেয় যখন কোনো সমাজ তার নৈতিক কণ্ঠস্বরকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, যখন সত্যভাষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে স্বৈরাচারের কাছে আত্মসমর্পণ করে। রোমের প্রজাতন্ত্র থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রসমূহের অভিজ্ঞতা বলে, গণতন্ত্রের পতন হঠাৎ ঘটে না। তা শুরু হয় বিবেকের ওপর আঘাত দিয়ে, প্রতিবাদকে অপরাধে পরিণত করে এবং ন্যায়কে ভীত করে তোলার মাধ্যমে।
হাদীর ওপর আঘাত সেই দীর্ঘ ও বিপজ্জনক প্রক্রিয়ারই একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই বাস্তবতায় শরিফ ওসমান হাদীর জীবন ও সংগ্রামকে জাতীয় বিবেকের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা আজ কোনো আবেগতাড়িত স্মরণ বা আবশ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আমাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
কারণ তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন মানুষকে স্মরণ করা নয় বরং ন্যায়বোধ, সাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কেন্দ্রস্থলে ফিরিয়ে আনা। আমরা যদি তাঁর সংগ্রামকে ইতিহাসের পাতায় সম্মানের সঙ্গে স্থাপন করতে ব্যর্থ হই, তবে তা হবে কেবল একজন শহীদের সঙ্গে অবিচার নয়; তা হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের নৈতিক ব্যর্থতার দলিল।
হাদীর দেশপ্রেম কেবল আবেগনির্ভর বা শ্লোগানসর্বস্ব কোনো অনুভূতি ছিল না; বরং তা ছিল যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক বৈষম্য প্রত্যক্ষ করা এবং রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের মুখোমুখি হওয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক গভীর নৈতিক দায়িত্ববোধ। তাঁর কাছে দেশপ্রেম মানে পতাকা বা উচ্চারণমাত্র নয়, বরং দেশের মানুষের প্রতি দায় স্বীকার করা; বিশেষত সেই মানুষদের প্রতি, যাঁরা ক্ষমতার ভাষায় অদৃশ্য থেকে যান।
এই অর্থে তাঁর দেশপ্রেম ছিল আত্মতুষ্টির নয়, আত্মসমালোচনার; প্রশংসার নয়, প্রশ্নের। রাজনৈতিক দর্শনের ভাষায় একে বলা যায় ‘নৈতিক দেশপ্রেম’ যেখানে দেশকে ভালোবাসা মানে ক্ষমতার প্রশংসা করা নয়, বরং ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্ন করার সৎ সাহস দেখানো; প্রয়োজনে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার নৈতিক ও কৌশলী রাজনীতিতে অবতীর্ণ হওয়া। এই ধারণা প্রাচীন গ্রিক দর্শন থেকেই আমাদের কাছে পরিচিত।
অ্যারিস্টটল (৩৮৪-৩২২ খ্রীস্টপূর্ব) বলেছিলেন, রাজনীতির লক্ষ্য কেবল শাসন নয়, বরং ‘সুন্দর জীবন’ (গুড লাইফ) নিশ্চিত করা, আর সেই জীবন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হলে রাষ্ট্র টেকে না। পরবর্তীতে সমকালীন চিন্তাবিদরাও একই সুরে বলেছেন নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন রাজনীতি সমাজকে স্থিতি দেয় না; বরং নাগরিক জীবনকে ক্রমশ বিষাক্ত, ভীতিকর ও অনিরাপদ করে তোলে। ওসমান হাদী এই বাস্তবতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি বিশ্বাস করতেন, নৈতিকতাবিহীন রাজনীতি মানুষের মুক্তি কিংবা কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। তাঁর আন্দোলন ও বক্তব্যে তাই ক্ষমতা দখলের তাড়না নয়, বরং ক্ষমতাকে নৈতিক মানদণ্ডে বাঁধার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
হাদী আমাদের নতুন প্রজন্মকে দেখিয়ে দিয়েছেন দেশপ্রেমের প্রকৃত রূপ হলো দেশের মানুষকে অন্যায় থেকে মুক্ত করার সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামে নৈতিক অবস্থানই সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। গণমানুষের অধিকার আদায়ে এই নৈতিক অবস্থানই তাঁকে ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা কৃত্রিম জনপ্রিয়তার মোহ থেকে সচেতনভাবে দূরে রেখেছিল। তিনি জানতেন যে, জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু নৈতিক অবস্থানই ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রাখে।
তাই তাঁর রাজনৈতিক পথচলা ছিল সুবিধাবাদের নয়, বরং নীতিনিষ্ঠতার; যেখানে লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার সান্নিধ্য অর্জন নয়, বরং ক্ষমতার চরিত্র বদলে দেওয়ার প্রচেষ্টা। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা ছিল তাঁর নৈতিক অবস্থানেরই এক বাস্তব ও সাহসী প্রকাশ।
এটি কোনো তাৎক্ষণিক কৌশল কিংবা নির্বাচনী হিসাব নয়; বরং আদর্শনিষ্ঠ এক ঘোষণাপত্র যার মাধ্যমে তিনি প্রথাগত রাজনৈতিক চিন্তাধারায় মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠিত দলীয় শৃঙ্খলা, অর্থবল কিংবা পেশিশক্তির বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, রাজনীতি গণমানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অভিজাত খেলা নয়; বরং নাগরিক দায়িত্ব ও নৈতিক সাহসের সমন্বিত চর্চা।
এই অবস্থানে তাঁর পথচলা অনেকটা বেগম রোকেয়ার কথাই আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, যিনি বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার ভেতরে অবস্থান করেই সেই ব্যবস্থার সীমা ভেঙে দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিলেন। হাদীও তাঁর মতই বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে নয়, বরং বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়েই বৃত্ত ভাঙার ব্রত নিয়েছিলেন।
ওসমান হাদীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার অভীপ্সা থেকে নয়; বরং তা ছিল ক্ষমতাবানদের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে হাতে–কলমে গণমুখী রাজনীতির পাঠ দেওয়ার প্রয়াস। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যাঁরা ক্ষমতার বাইরে বা ক্ষমতার প্রান্তে দাঁড়িয়ে ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেন, তাঁরাই দীর্ঘমেয়াদে সমাজের নৈতিক মানচিত্র বদলে দেন। তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের কাছেই তাঁরা হয়তো একা, বিতর্কিত বা অস্বস্তিকর মনে হন; কিন্তু সময়ের বিচারে তাঁদেরই অবস্থান হয়ে ওঠে নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ড। শরীফ ওসমান হাদীর রাজনৈতিক যাত্রাও সেই ধারারই অংশ যেখানে রাজনীতির মাপকাঠি ক্ষমতা নয়, ন্যায়; আর রাজনৈতিক সাফল্যের সংজ্ঞা সংসদে আসনসংখ্যা নয়, বিবেকের জাগরণের সক্ষমতা অর্জন। তাই হাদীর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ন্যায়বোধ ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন।
তাঁর দৃষ্টিতে রাষ্ট্র কোনো দলীয় যন্ত্র, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর হাতিয়ার কিংবা নির্বাচনী লাভ–ক্ষতির হিসাব নয়; বরং রাষ্ট্র হলো বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বসবাসকারী নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য গড়ে ওঠা এক নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই রাষ্ট্র যদি নাগরিকের জীবনের মূল্য, কণ্ঠস্বর ও ন্যায্যতার দায় স্বীকার করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার অস্তিত্ব নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে এই উপলব্ধিই তাঁর রাজনীতির মূল প্রেরণা ছিল।
ইংরেজ দার্শনিক জন লকের (১৬৩২-১৭০৪) ‘সামাজিক চুক্তি’ তত্ত্বের আলোকে বলা যায়, ওসমান হাদী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে রাষ্ট্রের বৈধতা কোনো ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, বলপ্রয়োগ কিংবা দলীয় আধিপত্য থেকে আসে না; তা আসে নাগরিকের সম্মতি, আস্থা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্য দিয়ে। লক যেমন বলেছিলেন, রাষ্ট্র গঠিত হয় মানুষের স্বাভাবিক অধিকার তথা জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য; হাদীর রাজনৈতিক অবস্থানও সেই নীতিরই সমকালীন প্রতিধ্বনি। তাঁর কাছে রাষ্ট্র যদি এই মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে নাগরিকের প্রশ্ন তোলার অধিকার শুধু বৈধই নয়, বরং নৈতিকভাবে অপরিহার্য। এই কারণেই তিনি রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত লাভ, দলীয় সুবিধা বা ক্ষমতার স্থায়িত্বের উপকরণ হিসেবে দেখতে অস্বীকার করেছেন। তাঁর রাজনীতি ছিল নাগরিককে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে নতুন করে ভাবার এক প্রচেষ্টা যেখানে শাসন মানে শোষণ নয়, আর কর্তৃত্ব মানে ভয় তৈরি করা নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিই হাদীকে প্রথাগত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং তাঁকে গণমানুষের অধিকার ও মর্যাদার এক স্পষ্ট ও নির্ভীক কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মানুষের প্রতি হাদীর ভালোবাসা কেবল আবেগঘন বক্তৃতা বা মঞ্চনির্ভর উচ্চারণে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা প্রকাশ পেয়েছিল নিঃস্বার্থ ও দায়িত্বশীল এক নৈতিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে নানামুখী প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। তিনি যে মানুষের কথা বলেছেন, তাঁদের সঙ্গেই থেকেছেন তাঁদের ভোগান্তি দেখেছেন ও শুনেছেন, সবার বঞ্চনার অভিজ্ঞতাকে নিজের রাজনৈতিক উপলব্ধির অংশ বানিয়েছেন।
এই কারণে তাঁর রাজনীতি ছিল গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে দূরত্বহীন; কেবল শোষিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিতের প্রতি সহানুভূতি নয়, হয়ে ওঠেছে সহমর্মিতা ও সহভাগিতার রাজনীতি।
তিনি ভালো করেই জানতেন, ন্যায়ের পথে তাঁর এই প্রতিবাদী অবস্থান তাঁকে কায়েমী সুবিধাবাদীদের আক্রমণের নিশানা বানাবে। অধিকারহারা বঞ্চিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে প্রায়শই একা হয়ে যাওয়া, এমনকি পরিচিত মহল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, সুবিধাজনক নীরবতার বাইরে চলে যাওয়া।
এই সত্য তিনি গোপন করেননি; বরং সুস্পষ্টভাবে তাঁর বক্তব্যে তা তুলে ধরেছেন। তবু সেই নিঃসঙ্গতাকে তিনি দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি; বরং সচেতনভাবে বেছে নিয়েছিলেন এবং হাসি মুখে আলিঙ্গন করেছেন এক নৈতিক অবস্থান হিসেবে এক দুর্দান্ত সাহসে ও সুতীব্র বিশ্বাসে। কারণ তাঁর কাছে আদর্শই ছিল রাজনীতির সর্বোচ্চ মানদণ্ড জনমত, ক্ষমতা কিংবা স্বল্পমেয়াদি লাভ নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত পরিবর্তন আসে বক্তৃতার চেয়ে দৃষ্টান্তের মাধ্যমে। দৃষ্টান্তই হলো সেই সূচনাবিন্দু, যেখান থেকে পরিবর্তনের রাজপথ তৈরি হয়।
তাই তাঁর নিজের জীবন ও আচরণকেই তিনি রাজনৈতিক বার্তায় রূপ দিয়েছিলেন। এই অর্থে ওসমান হাদীর জীবন ছিল এক জীবন্ত পাঠ যেখানে শেখানো হয়েছে, ন্যায়কে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়; ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসই শেষ পর্যন্ত সমাজকে এবং ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
আজ যখন আমাদের সমাজের সর্বত্র আপস, সুবিধাবাদ ও নীরবতার সংস্কৃতি জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেছে এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নানাস্তরে, ঠিক তখনই শরিফ ওসমান হাদীর মতো একজন সাধারণ মানুষ ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতির বিবেকের প্রতীকে রূপান্তরিত হন; হয়ে ওঠেন জাতীয় বীর। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে নৈতিক সংকটের মুহূর্তে তিনি কেবল প্রতিবাদী কণ্ঠই নয়; বরং হয়ে ওঠেন ভেঙেপড়া সমাজ কাঠামো ও রাষ্ট্রবির্নিমাণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এক নৈতিক বৈপ্লবিক উদাহরণ এবং ইনসাফের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কালচারাল আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আজাদীর আন্দোলেনর সুদৃঢ় সেতু। তাই গণঅভ্যুত্থানের পর উদ্ভূত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পেছনমুখী স্রোতকে ঠেকাতে হাদীর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট ও অটল।
তিনি আপসের আরামদায়ক নীরবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সাহসকে সামাজিক দায়ে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর সেই অবস্থান কেবল ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ নয়, বরং তিনি সেটা বাস্তবে প্রয়োগ করেছেন গণমানুষের স্বার্থ রক্ষা ও ন্যায়বিচারের জন্য নিখুঁত সামষ্টিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলার জন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব গ্রহণের মাধ্যমে।
এই যোগ্য ও শক্তিমান সাহসের কারণেই কায়েমী স্বার্থান্বেষী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী মহলের কোপানালে তিনি অকালে প্রাণ হারিয়েছেন, কিন্তু তাঁর নৈতিক প্রেরণা চিরজাগরুক থাকবে আগামীর প্রজন্মের কাছে।
দল, মত, ধর্ম, বর্ণ বা পেশা নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশীর জন্য ওসমান হাদী লড়েছেন ইনসাফের পক্ষে, জুলুমের বিপক্ষে, বৈদেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জাতি হিসেবে আত্মমর্যাদা রক্ষায়, এবং রাষ্ট্রের সার্বিক স্বাধীনতা ও জনগণের কল্যাণের জন্য। এই কারণেই শরিফ ওসমান হাদী কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি এক নৈতিক অবস্থানের নাম যেখানে আজাদীর আকাঙ্ক্ষায় ন্যায়, মানবিকতা এবং গণমুখী রাজনীতি সমানভাবে প্রতিফলিত হয়।
তাঁর জীবন ও চিন্তা নতুন প্রজন্মকে শেখিয়েছে কীভাবে ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে হয়, প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে হয়, এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কীভাবে সামষ্টিক কল্যাণে ন্যায়ের পক্ষে লড়তে হয়। ইতিহাস প্রমাণ দেয়, যাঁরা সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ান, তাঁদের কণ্ঠ সময়ের সীমা পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে পথ দেখায়।
সেই অর্থে, শহীদ শরীফ ওসমান হাদী বাংলাদেশের এ প্রজন্মের তরুণদের সামষ্টিক স্মৃতিতে রয়ে যাবেন যুগের নাকিব হিসেবে। আর আগামী প্রজন্মের কাছে তিনি উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের এক নৈতিক মাপকাঠি হিসেবে, যাঁরা বাংলাদেশকে এবং এদেশের মানুষকে ভালোবাসে তাঁদের সচেতন, দায়বদ্ধ এবং গণমুখী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতে শেখাবে। তাঁর দেখানো নৈতিক সাহস ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার পথেই হয়ত বাংলাদেশের মানুষ খুঁজবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তাই গণমানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে ওসমান হাদী বাংলাদেশের ইতিহাসে রয়ে যাবে যুগসন্ধির এক বৈপ্লবিক নেতা হিসেবে।
* লিখেছেন: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।




















































