যুক্তরাষ্ট্রের বামপন্থী রাজনীতির তরুণ উদীয়মান নেতা জোহরান মামদানি বৃহস্পতিবার ভোরে নিউইয়র্ক সিটি মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন। চার বছরের এই মেয়াদকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মামদানি সংঘাতে জড়াতে পারেন বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
নিউইয়র্ক থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
৩৪ বছর বয়সি এই ডেমোক্র্যাট নেতা মধ্যরাতের পরপরই সিটি হলের নিচে অবস্থিত পরিত্যক্ত একটি সাবওয়ে স্টেশনে শপথ গ্রহণ করেন এবং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শহরের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র।
তার কার্যালয় জানায়, সিটি হলের নিচের সাধারণ ভেন্যুটি শ্রমজীবী মানুষের প্রতি তার অঙ্গীকারের প্রতিফলন, কারণ তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
শপথ নেওয়ার পর মামদানি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটি সত্যিই আমার জীবনের সর্বোচ্চ সম্মান ও সৌভাগ্য।’
এক বছর আগেও প্রায় অচেনা এই রাজনীতিবিদ ভাড়া স্থগিত, সার্বজনীন শিশু পরিচর্যা এবং বিনামূল্যে গণপরিবহন চালুর মতো উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবেন কী না, সেটিই দেখার বিষয়।
নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জন কেইন বলেন, নির্বাচন শেষ হলে প্রতীকী বিষয়গুলোর প্রভাব সীমিত থাকে। তখন ফলাফলই ভোটারদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্পের আচরণও এখানে নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে।
নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা রিপাবলিকান ট্রাম্প বারবার মামদানির সমালোচনা করেছেন, তবে নভেম্বর মাসে হোয়াইট হাউসে তাদের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক লিংকন মিচেল বলেন, ওই বৈঠকটি ‘মামদানির দৃষ্টিকোণ থেকে যতটা ভালো হওয়া সম্ভব ছিল, ততটাই ভালো ছিল।’
তবে, তিনি সতর্ক করেন, তাদের সম্পর্ক দ্রুতই খারাপ হয়ে যেতে পারে।
একটি সম্ভাব্য সংঘাতের জায়গা হলো- অভিবাসন অভিযান, কারণ ট্রাম্প সারা দেশে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন। মামদানি অভিবাসী সম্প্রদায়কে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নভেম্বরের ভোটের আগে ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, মামদানিকে বেছে নিলে নিউইয়র্কের ফেডারেল তহবিল কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। সে সময় তিনি মামদানিকে ‘উন্মাদ কমিউনিস্ট’ আখ্যায়িত করেন।
নভেম্বরের ভোটের আগে প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছিলেন, নিউ ইয়র্ক যদি মামদানিকে বেছে নেয় তবে তিনি ফেডারেল অর্থায়ন কমিয়ে দেবেন। ট্রাম্প তাকে ‘কমিউনিস্ট উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেছিলেন। অন্যদিকে, মেয়ার নির্বাচিত মামদানি বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন ট্রাম্প একজন ফ্যাসিস্ট।
মেয়রের চার বছরের মেয়াদ শুরুর জন্য মামদানির ব্যক্তিগত শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন নিউ ইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমস, যিনি ট্রাম্পকে প্রতারণার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার পরে একটি বড় আকারের আনুষ্ঠানিক অভিষেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে বামপন্থী মিত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোর্তেজ ভাষণ দেবেন।
সিটি হলের বাইরে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে প্রায় ৪ হাজার টিকিটধারী অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
মামদানির দল ব্রডওয়ে বরাবর রাস্তার পাশে দর্শনীয় স্থান তৈরি করে হাজার হাজার মানুষকে অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, শহরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একাধিক কুরআন ব্যবহার করে মেয়র হিসেবে শপথ নেবেন মামদানি— দু’টি তার পরিবারের এবং একটি পুয়ের্তো রিকোতে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণাঙ্গ লেখক আর্তুরো শমবার্গের ছিল।
নতুন দায়িত্বের সঙ্গে তার ঠিকানাও বদলাচ্ছে। কুইন্সে ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে তিনি ম্যানহাটনের বিলাসবহুল মেয়রের বাসভবনে যাচ্ছেন। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়ত সেখানে যাবেন না, কারণ তিনি সাশ্রয়ী আবাসনের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। মামদানি বলেছেন, তিনি মূলত নিরাপত্তার কারণে সেখানে যাচ্ছেন।
উগান্ডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া মামদানি সাত বছর বয়সে নিউ ইয়র্কে আসেন। অল্প সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য হন এবং পরে মেয়র নির্বাচিত হন।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে তিনি পূর্ববর্তী মেয়র প্রশাসন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সরকার থেকে অভিজ্ঞ উপদেষ্টাদের নিয়োগ দিচ্ছেন।
তিনি ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছেন। কেউ কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মামদানি জিতলে ধনী নিউ ইয়র্কবাসীরা ব্যাপক হারে শহর ছাড়বেন। তবে রিয়েল এস্টেট নেতারা সেই দাবি খণ্ডন করেছেন।
ফিলিস্তিনি অধিকার রক্ষাকারী হিসেবে তাকে ইহুদি সম্প্রদায়কে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে হবে। সম্প্রতি তার এক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী পদত্যাগ করেছেন, কারণ জানা গেছে তিনি বহু বছর আগে ইহুদিবিরোধী টুইট করেছিলেন।



































