মঙ্গলবার | ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | শীতকাল
শিরোনাম :
Logo কেউ নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করলে আইনি ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা Logo এনবিআরের ওয়েবসাইটে এইচএস কোডভিত্তিক আমদানি তথ্য প্রকাশ Logo গাজীপুর-৪ আসনের দুই প্রার্থীর হাতে তৌফিক সুলতান স্যারের ‘জ্ঞানের জগৎ’ বই Logo পবিত্র লাইলাতুল বরাত আনজুমান ট্রাস্ট’র ব্যবস্থাপনায় কর্মসূচি Logo পলাশবাড়ীতে ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভ Logo পলাশবাড়ীর কালিবাড়ী হাটে পেটে ও মাথায় ছুরিকাঘাতে আহত মুরগীর ব্যবসায়ী Logo ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকতে হবে: উপ-উপাচার্য Logo ইইউ’র সঙ্গে দ্রুত এফটিএ নিয়ে আলোচনা শুরুর আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার Logo নোবিপ্রবিতে কোটি টাকার প্রকল্পে ছাত্রদল নেতাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ Logo পলাশবাড়ী উপজেলায় ৭১ টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে অতিগুরুত্বপুর্ন ১১ টি ও সাধারণ ৬০ টি ভোট কেন্দ্র নির্দ্ধারন

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্ম-বিশ্বাস

  • নীলকন্ঠ অনলাইন নীলকন্ঠ অনলাইন
  • আপডেট সময় : ১১:৩৮:৫২ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
  • ৮০০ বার পড়া হয়েছে
কোরআন নাজিলের সময় আরব ভূখণ্ডে কয়েকটি মৌলিক ধর্ম প্রচলিত ছিল। সেগুলো হলো, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, মাজুসি ধর্ম, সাবিয়ি ধর্ম, হানিফি ধর্ম। হানিফি ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মগুলোর কথা কোরআন বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে বর্ণনা করেছে। যেমন নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি হয়েছে এবং যারা খ্রিস্টান ও সাবিয়ি…।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬২)

অন্য আয়াতে এসেছে, যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি, যারা সাবিয়ি, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন।’ (সুরা হজ, আয়াত : ১৭)

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্ম সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো,

ইহুদি ধর্ম

পবিত্র কোরআনে ইহুদিদের নিন্দনীয় চারিত্রিক বিষয় উন্মোচন করা হয়েছে স্পষ্টভাবে, তবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের নিন্দা করা হয়েছে শুধু এই কথা বলে, `আর ইহুদিরা বলে উজাইর আল্লাহর পুত্র।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩০)

এখানে উজাইরের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইহুদি পুরোহিত আজরা, যিনি তাওরাতকে তার অলেৌকিক ক্ষমতার দ্বারা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। ইবনু জারির আত-তাবারি (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মদিনায়ও কিছু লোক ছিল, যারা এই মতাদর্শের অনুসারী ছিল। ইবনু হাজম (রহ.) বলেছেন, `ইহুদিদের মধ্যে সাদুকি উপদল এই বিশ্বাস ধারণ করত। সাদুক নামে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র কবে এই উপদল গড়ে উঠেছিল। ইহুদিদের মধ্যে কেবল তারাই বলতো যে নিশ্চয়ই উজাইর আল্লাহর পুত্র। এমন অপবাদ থেকে আল্লাহ পবিত্র, সুমহান। এই উপদল ইয়েমেনের দিকে বসবাস করতো। (আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, খণ্ড, ১, পৃষ্ঠা : ১৯)

খ্রিস্টধর্ম

খ্রিস্টানরা উমর (রা.)-এর যুগ থেকেই আরব ভূখণ্ড থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে খ্রিস্টানদের প্রত্যেক উপদলই দাবি করে থাকে যে তারাই মূল ধর্মের ওপর অটল আছে। ইয়াকুবি (Jacobite) উপদলভুক্ত আরব খ্রিস্টান আবুল ফারাজ আল-মালাতাই ইবনুল ইবরি (Gregory Bar Hebraeus) ছিলেন হিজরি ষষ্ঠ শতকের একজন ঐতিহাসিক। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে আরবেরা সবাই ছিল জেকোবাইট বা ইয়াকুবি খ্রিস্টান।

পবিত্র কোরআনে চারটি জায়গায় খ্রিস্টানদের ধর্মবিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান ও খণ্ডন করেছে।

প্রথম আয়াত: হে কিতাবিরা (ইহুদি ও নাসারা), তোমাদের দ্বিনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া কিছু বলো না। মারইয়াম তনয় ঈসা মাসিহ তো আল্লাহর রাসুল ও তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন, এবং তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও রাসুলে ঈমান আনো এবং বলো না তিন!’ (তাদের মতে, খোদা, ঈসা, জিবরাইল (মতান্তরে জননী মারয়াম) এই তিন মাবুদ। এরূপ (তিন মাবুদ বলা) থেকে নিবৃত্ত হও, তা (নিবৃত্তি) তোমাদের জন্যে কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তঁার সন্তান হবে তিনি তা থেকে পবিত্র।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১)

দ্বিতীয় আয়াত: যারা বলে, আল্লাহই মারইয়াম-তনয় মাসিহ, তারা তো কুফরি করেছে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৭২)

তৃতীয় আয়াত: যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা তো কুফরি করেছেই যদিও এক ইলাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৭৩)

চতুর্থ আয়াত: স্মরণ করো, আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তুমি কি লোকদের বলেছ যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১১৬)

মাজুসি ধর্ম
মাজুসি ধর্ম ইরানের একটি প্রাচীন ধর্ম। বলা হয়ে থাকে যে জরথ্রুস্ট এই ধর্মের প্রবর্তক। জরথ্রুস্ট নিজেকে মাজুস বলতেন না। আরবি ভাষায় মাজুস শব্দটি এসেছে গ্রিক থেকে। ফারসি ভাষায় মূল শব্দটি হলো মুগ। মাজুসরা দুজন প্রভুতে বা দেবতায় বিশ্বাস করতো। তাদের একজন হলো ইয়াজদান এবং দ্বিতীয়জন হলো আহারমান। ইয়াজদান ছিলো কল্যাণের দেবতা এবং আহারমান ছিলো অনিষ্টের দেবতা। তারা ইয়াজদান বলে আলো বোঝাতো এবং আহারমান বলে বোঝাতো অন্ধকার। পবিত্র কোরআন মাজুস আরবদের আকিদা বাতিল ঘোষণা করেছে, আল্লাহ বললেন, তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না; তিনিই তো একমাত্র ইলাহ।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫১০) মাজুস নামটি পবিত্র কোরআনে একবারই উচ্চারিত হয়েছে, সুরা হজের ১৭ নম্বর আয়াতে।

সাবিয়ি ধর্ম

পবিত্র কুরআনে সাবিয়ি নামটি তিনবার বর্ণিত হয়েছে। সাবিয়ি ধর্মের সাবিয়িদের উত্স হলো বাবেল। এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই অঞ্চলে নক্ষত্রপূজার প্রচলন ছিলো বহু প্রাচীনকাল থেকে। তা ছাড়া তাদের মধ্যে আত্মাপূজার প্রথাও ছিলো। নক্ষত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলো তাদের উপাসনালয় ছিলো।

আরবি ও ইংরেজি উভয় ভাষায় রচিত তথ্য-উত্স থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তা ছিলো প্রাচীন ইরাকের ধর্ম। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেসব ধর্ম সেখানে প্রাধান্য লাভ করেছিলো সেগুলোর কিছু কিছু অংশ সেই ধর্মের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলো। তাতে সংশে্লষণ ঘটেছিলো বনু ইসরাইলের ইহুদি ধর্মাদর্শের, ইরানিদের মাজুসি ধর্মের, গ্রিকদের দর্শনের ও রোমানদের খ্রিস্টধর্মের।

তারা আল্লাহর প্রতি এক ইলাহ হিসেবে বিশ্বাস রাখতো। কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রের আত্মাসমূহকে ইলাহ ও তার বান্দাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী মনে করতো। তারা নক্ষত্রপূজা করতো দৈনিক তিনবার ভোর থেকে সূর্যদয় পর্যন্ত, দ্বিপ্রহরের সময়, এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। (ইসলামে এই তিনটি সময়ে নামাজ পড়তে নিষেধাজ্ঞা আছে, যাতে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়)  তারা বিশ্বাস করতো যে সব নক্ষত্রের কেন্দ্র হলো উত্তর মেরু এবং সব নক্ষত্র পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে নিজ নিজ স্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে ও পিছিয়ে আসছে। কিন্তু মেরুবর্তী নক্ষত্র একই অবস্থায় নিজ স্থানে স্থির রয়েছে। ফলে এই নক্ষত্রই ছিলো তাদের কিবলা, এর দিকে মুখ করে তারা উপাসনা ও প্রার্থনা করতো। দৈনিক তিনবার প্রত্যেক নামাজের জন্যে তারা গোসল করতো।

হানিফিয়্যাহ বা হানিফি ধর্ম

হানিফিয়্যাহ বা হানিফি ধর্মের অর্থ ও তাত্পর্য আমাদের সামনে সুস্পষ্ট। এই প্রসঙ্গে মুফাসসিরদের মধ্যে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়।

হানিফ অর্থ স্খলিত হওয়া। অথচ এটি সত্য ধর্ম। এর অর্থ হওয়া উচিত সরলতা ও অটলতা।  আরবদের নিকট হানিফ শব্দটি ইবরাহিম (আ.)-এর উপাধি। তাই তারা তার ধর্মের নাম দিয়েছে মিল্লাত হানিফিয়্যাহ’। আরবের সত্ মানুষেরা তাদের চারপাশে বিদ্যমান যাবতীয় বাতিল ও বিকৃত ধর্ম মূর্তিপূজা, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম ইত্যাদি থেকে হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং ভিন্ন ধর্মের খঁোজ করছিল। তারা অবশেষে দ্বিনে হানিফে স্বস্তি খুঁজে পায়।

ইসলামের শুরুর যুগে যারা হানিফ নামে পরিচিত ছিলেন তাঁরা তাদের ধর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন না এবং সত্যানুসন্ধানী ছিলেন। যেমন কুস ইবনু সায়িদা, ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল, উসমান ইবনু হুওয়াইরিস, উমাইয়া ইবনু আবুস সালত, জায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল, কায়স ইবনু নুশবাহ, আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ। তাঁরা মূর্তিপূজা থেকে নিজেদের পবিত্র রেখেছিলেন এবং বেরিয়ে পড়েছিলেন সত্যধর্মের সন্ধানে। তাঁদের কেউ কেউ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন কুস ইবনু সায়িদা ও ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল। কেউ কেউ সত্যানুসন্ধানের পথে প্রাণ হারিয়েছিলেন, যেমন, জায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল ও উমাইয়া ইবনু আবুস সান্ত। অন্যরা ইসলাম পেয়েছেন এবং সত্যের ও দ্বিনে হানিফের আলো দেখেছেন। তাঁরা এই আলোতে নিজেদের আলোকিত করেছেন।

জাহিলি যুগের কতিপয় কবির কবিতায় সত্যের কিছু বাণী অন্ধকার রাতে নক্ষত্ররাজির ঔজ্জ্বল্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যেমন, লাবিদ, জুহাইর, উমাইয়া ইবনু আবুস সালত, ইলাফ ইবনু শিহাব আত-তামিমি, কুসস ইবনু সায়িদা আল-আয়াদি। আমরা তাঁদের কবিতায় পাই তাওহিদের শিক্ষা, হাশর-নাশর ও উত্তম চরিত্রের বর্ণনা। এই ছিল ইসলাম-পূর্ব আরবের ধর্ম-বিশ্বাস।

ট্যাগস :
জনপ্রিয় সংবাদ

কেউ নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ করলে আইনি ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্ম-বিশ্বাস

আপডেট সময় : ১১:৩৮:৫২ পূর্বাহ্ণ, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল ২০২৫
কোরআন নাজিলের সময় আরব ভূখণ্ডে কয়েকটি মৌলিক ধর্ম প্রচলিত ছিল। সেগুলো হলো, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম, মাজুসি ধর্ম, সাবিয়ি ধর্ম, হানিফি ধর্ম। হানিফি ধর্ম ছাড়া অন্য ধর্মগুলোর কথা কোরআন বিভিন্ন স্থানে একসঙ্গে বর্ণনা করেছে। যেমন নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে, যারা ইহুদি হয়েছে এবং যারা খ্রিস্টান ও সাবিয়ি…।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬২)

অন্য আয়াতে এসেছে, যারা ঈমান এনেছে এবং যারা ইহুদি, যারা সাবিয়ি, খ্রিস্টান ও অগ্নিপূজক এবং যারা মুশরিক হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের মধ্যে ফায়সালা করে দেবেন।’ (সুরা হজ, আয়াত : ১৭)

ইসলামপূর্ব আরবের ধর্ম সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো,

ইহুদি ধর্ম

পবিত্র কোরআনে ইহুদিদের নিন্দনীয় চারিত্রিক বিষয় উন্মোচন করা হয়েছে স্পষ্টভাবে, তবে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের নিন্দা করা হয়েছে শুধু এই কথা বলে, `আর ইহুদিরা বলে উজাইর আল্লাহর পুত্র।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩০)

এখানে উজাইরের দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ইহুদি পুরোহিত আজরা, যিনি তাওরাতকে তার অলেৌকিক ক্ষমতার দ্বারা পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। ইবনু জারির আত-তাবারি (রহ.) আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, মদিনায়ও কিছু লোক ছিল, যারা এই মতাদর্শের অনুসারী ছিল। ইবনু হাজম (রহ.) বলেছেন, `ইহুদিদের মধ্যে সাদুকি উপদল এই বিশ্বাস ধারণ করত। সাদুক নামে একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র কবে এই উপদল গড়ে উঠেছিল। ইহুদিদের মধ্যে কেবল তারাই বলতো যে নিশ্চয়ই উজাইর আল্লাহর পুত্র। এমন অপবাদ থেকে আল্লাহ পবিত্র, সুমহান। এই উপদল ইয়েমেনের দিকে বসবাস করতো। (আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, খণ্ড, ১, পৃষ্ঠা : ১৯)

খ্রিস্টধর্ম

খ্রিস্টানরা উমর (রা.)-এর যুগ থেকেই আরব ভূখণ্ড থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে খ্রিস্টানদের প্রত্যেক উপদলই দাবি করে থাকে যে তারাই মূল ধর্মের ওপর অটল আছে। ইয়াকুবি (Jacobite) উপদলভুক্ত আরব খ্রিস্টান আবুল ফারাজ আল-মালাতাই ইবনুল ইবরি (Gregory Bar Hebraeus) ছিলেন হিজরি ষষ্ঠ শতকের একজন ঐতিহাসিক। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেন যে আরবেরা সবাই ছিল জেকোবাইট বা ইয়াকুবি খ্রিস্টান।

পবিত্র কোরআনে চারটি জায়গায় খ্রিস্টানদের ধর্মবিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান ও খণ্ডন করেছে।

প্রথম আয়াত: হে কিতাবিরা (ইহুদি ও নাসারা), তোমাদের দ্বিনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করো না এবং আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া কিছু বলো না। মারইয়াম তনয় ঈসা মাসিহ তো আল্লাহর রাসুল ও তাঁর বাণী, যা তিনি মারইয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন, এবং তাঁর আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ ও রাসুলে ঈমান আনো এবং বলো না তিন!’ (তাদের মতে, খোদা, ঈসা, জিবরাইল (মতান্তরে জননী মারয়াম) এই তিন মাবুদ। এরূপ (তিন মাবুদ বলা) থেকে নিবৃত্ত হও, তা (নিবৃত্তি) তোমাদের জন্যে কল্যাণকর হবে। আল্লাহ তো একমাত্র ইলাহ; তঁার সন্তান হবে তিনি তা থেকে পবিত্র।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭১)

দ্বিতীয় আয়াত: যারা বলে, আল্লাহই মারইয়াম-তনয় মাসিহ, তারা তো কুফরি করেছে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৭২)

তৃতীয় আয়াত: যারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন, তারা তো কুফরি করেছেই যদিও এক ইলাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৭৩)

চতুর্থ আয়াত: স্মরণ করো, আল্লাহ যখন বলবেন, হে মারইয়াম-তনয় ইসা, তুমি কি লোকদের বলেছ যে তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ করো?’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ১১৬)

মাজুসি ধর্ম
মাজুসি ধর্ম ইরানের একটি প্রাচীন ধর্ম। বলা হয়ে থাকে যে জরথ্রুস্ট এই ধর্মের প্রবর্তক। জরথ্রুস্ট নিজেকে মাজুস বলতেন না। আরবি ভাষায় মাজুস শব্দটি এসেছে গ্রিক থেকে। ফারসি ভাষায় মূল শব্দটি হলো মুগ। মাজুসরা দুজন প্রভুতে বা দেবতায় বিশ্বাস করতো। তাদের একজন হলো ইয়াজদান এবং দ্বিতীয়জন হলো আহারমান। ইয়াজদান ছিলো কল্যাণের দেবতা এবং আহারমান ছিলো অনিষ্টের দেবতা। তারা ইয়াজদান বলে আলো বোঝাতো এবং আহারমান বলে বোঝাতো অন্ধকার। পবিত্র কোরআন মাজুস আরবদের আকিদা বাতিল ঘোষণা করেছে, আল্লাহ বললেন, তোমরা দুই ইলাহ গ্রহণ করো না; তিনিই তো একমাত্র ইলাহ।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৫১০) মাজুস নামটি পবিত্র কোরআনে একবারই উচ্চারিত হয়েছে, সুরা হজের ১৭ নম্বর আয়াতে।

সাবিয়ি ধর্ম

পবিত্র কুরআনে সাবিয়ি নামটি তিনবার বর্ণিত হয়েছে। সাবিয়ি ধর্মের সাবিয়িদের উত্স হলো বাবেল। এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই অঞ্চলে নক্ষত্রপূজার প্রচলন ছিলো বহু প্রাচীনকাল থেকে। তা ছাড়া তাদের মধ্যে আত্মাপূজার প্রথাও ছিলো। নক্ষত্রের নামে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলো তাদের উপাসনালয় ছিলো।

আরবি ও ইংরেজি উভয় ভাষায় রচিত তথ্য-উত্স থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তা ছিলো প্রাচীন ইরাকের ধর্ম। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেসব ধর্ম সেখানে প্রাধান্য লাভ করেছিলো সেগুলোর কিছু কিছু অংশ সেই ধর্মের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিলো। তাতে সংশে্লষণ ঘটেছিলো বনু ইসরাইলের ইহুদি ধর্মাদর্শের, ইরানিদের মাজুসি ধর্মের, গ্রিকদের দর্শনের ও রোমানদের খ্রিস্টধর্মের।

তারা আল্লাহর প্রতি এক ইলাহ হিসেবে বিশ্বাস রাখতো। কিন্তু গ্রহ-নক্ষত্রের আত্মাসমূহকে ইলাহ ও তার বান্দাদের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী মনে করতো। তারা নক্ষত্রপূজা করতো দৈনিক তিনবার ভোর থেকে সূর্যদয় পর্যন্ত, দ্বিপ্রহরের সময়, এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত। (ইসলামে এই তিনটি সময়ে নামাজ পড়তে নিষেধাজ্ঞা আছে, যাতে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য না হয়)  তারা বিশ্বাস করতো যে সব নক্ষত্রের কেন্দ্র হলো উত্তর মেরু এবং সব নক্ষত্র পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে নিজ নিজ স্থান থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে ও পিছিয়ে আসছে। কিন্তু মেরুবর্তী নক্ষত্র একই অবস্থায় নিজ স্থানে স্থির রয়েছে। ফলে এই নক্ষত্রই ছিলো তাদের কিবলা, এর দিকে মুখ করে তারা উপাসনা ও প্রার্থনা করতো। দৈনিক তিনবার প্রত্যেক নামাজের জন্যে তারা গোসল করতো।

হানিফিয়্যাহ বা হানিফি ধর্ম

হানিফিয়্যাহ বা হানিফি ধর্মের অর্থ ও তাত্পর্য আমাদের সামনে সুস্পষ্ট। এই প্রসঙ্গে মুফাসসিরদের মধ্যে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়।

হানিফ অর্থ স্খলিত হওয়া। অথচ এটি সত্য ধর্ম। এর অর্থ হওয়া উচিত সরলতা ও অটলতা।  আরবদের নিকট হানিফ শব্দটি ইবরাহিম (আ.)-এর উপাধি। তাই তারা তার ধর্মের নাম দিয়েছে মিল্লাত হানিফিয়্যাহ’। আরবের সত্ মানুষেরা তাদের চারপাশে বিদ্যমান যাবতীয় বাতিল ও বিকৃত ধর্ম মূর্তিপূজা, ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টধর্ম ইত্যাদি থেকে হতাশ হয়ে পড়েছিল এবং ভিন্ন ধর্মের খঁোজ করছিল। তারা অবশেষে দ্বিনে হানিফে স্বস্তি খুঁজে পায়।

ইসলামের শুরুর যুগে যারা হানিফ নামে পরিচিত ছিলেন তাঁরা তাদের ধর্ম সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন না এবং সত্যানুসন্ধানী ছিলেন। যেমন কুস ইবনু সায়িদা, ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল, উসমান ইবনু হুওয়াইরিস, উমাইয়া ইবনু আবুস সালত, জায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল, কায়স ইবনু নুশবাহ, আবদুল্লাহ ইবনু জাহাশ। তাঁরা মূর্তিপূজা থেকে নিজেদের পবিত্র রেখেছিলেন এবং বেরিয়ে পড়েছিলেন সত্যধর্মের সন্ধানে। তাঁদের কেউ কেউ খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যেমন কুস ইবনু সায়িদা ও ওয়ারাকা ইবনু নাওফাল। কেউ কেউ সত্যানুসন্ধানের পথে প্রাণ হারিয়েছিলেন, যেমন, জায়েদ ইবনু আমর ইবনু নুফাইল ও উমাইয়া ইবনু আবুস সান্ত। অন্যরা ইসলাম পেয়েছেন এবং সত্যের ও দ্বিনে হানিফের আলো দেখেছেন। তাঁরা এই আলোতে নিজেদের আলোকিত করেছেন।

জাহিলি যুগের কতিপয় কবির কবিতায় সত্যের কিছু বাণী অন্ধকার রাতে নক্ষত্ররাজির ঔজ্জ্বল্যের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। যেমন, লাবিদ, জুহাইর, উমাইয়া ইবনু আবুস সালত, ইলাফ ইবনু শিহাব আত-তামিমি, কুসস ইবনু সায়িদা আল-আয়াদি। আমরা তাঁদের কবিতায় পাই তাওহিদের শিক্ষা, হাশর-নাশর ও উত্তম চরিত্রের বর্ণনা। এই ছিল ইসলাম-পূর্ব আরবের ধর্ম-বিশ্বাস।