তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ পরিবারের অনেকের নামে ও গ্রুপের ১৪ জন কর্মকর্তার নামে প্রায় ৩৫টি মিথ্যা মামলা করা হয়। একইভাবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে গ্রুপের চেয়ারম্যান ও পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ১৫টি মিথ্যা মামলা হয়েছে। অনেককে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়ে ১২ বছরের বেশি জেল খাটিয়েছে।’
১-১১-এর সরকারের আমলে জুলুমের শিকার ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক ওই পরিচালকদের দিয়ে আমাদের গ্রুপের জমি বিক্রি করে ২৫৬ কোটি টাকা তৎকালীন একটি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়ে যায়। আমাদের কম্পানির নামে থাকা একটি প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার শেয়ার জোরপূর্বক অন্যের নামে লিখিয়ে নিয়ে যায়। পরে টাকা ফেরত চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করলে ফেরত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়, যা পরে আপিল বিভাগও ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই টাকার একটি কানাকড়ি আজও ফেরত পায়নি।’
এক-এগারোর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, ‘বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা কারাগারে থাকায় তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধস নামতে থাকে। খেলাপি হতে থাকে একের পর এক প্রতিষ্ঠান। মাসের পর মাস বকেয়া পড়ে কর্মীদের বেতন। ওই অবস্থায় অনেকেই কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হন। আবার কোনো কোনো কর্মী স্বেচ্ছায় চাকরিতে ইস্তফা দেন। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশেরও বেশি।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) তখনকার এক গবেষণার তথ্য মতে, ‘ওই সময় চাল, আটা, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে নতুন করে দুই কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশ।’
কেমন আছেন ব্যবসায়ীরা, কী বলছেন তারা
ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে নানা কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য যেভাবে স্থবির ছিল, নতুন সরকার আসার পর তাতে গতি ফিরবে। উল্টো শিল্প-কারখানায় হামলা-ভাঙচুর, ব্যবসায়ীদের নামে হত্যা মামলা হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এখন আশাহত। নতুন বিনিয়োগ দূরে থাক, তারা কারখানা চালিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। সম্প্রতি একজন গার্মেন্ট উদ্যোক্তাকেও পিটিয়েছে একটি পক্ষ। এতে ১০টি ব্যাবসায়িক সমিতি উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। ডিসিসিআইয়ের ব্যাবসায়িক সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে জানিয়েছে। তারা বলছেন, উচ্চ সুদের হার, শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা, বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকটসহ নানা কারণে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এর ফলে তলানিতে এসে ঠেকেছে শিল্পোৎপাদন। এর নেতিবাচক প্রভাব সামনে পড়তে পারে ‘সাপ্লাই চেইনে’ এখন এ আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও মাল্টিমোড গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘দেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, তারাই নিগৃহীত ছিলেন। বেকারদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে দরকার বিনিয়োগ, কিন্তু দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। বিনিয়োগকারীরা এখন চতুর্মুখী বিপদের সম্মুখীন। ব্যবসায়ীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ সরকারের নেওয়া উচিত ছিল।’
স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও টেকসই প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআইইউবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. হুমায়রা ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি খাতে ব্যবসায়ীদের আস্থার পরিবেশ ফেরানো অত্যন্ত জরুরি। ক্ষতি পোষাতে ও পূনর্বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সেটা না হলে পণ্য সরবরাহ যেমন, ক্ষুদ্র তারকাঁটা থেকে খাদ্যসামগ্রী—সব কিছুতেই মারাত্মক সংকট দেখা দেবে। তার ভুক্তভোগী নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত সকল প্রকার ভোক্তাই হবেন।’
আইনজ্ঞরা বলছেন, বড় বড় ব্যবসায়ীদের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা কেবল আইনের ব্যত্যয়ই নয়, দেশের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের পরিপন্থী। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সারা দেশে অনেকের নামে মামলা হয়। এতে এমন ব্যবসায়ীদেরও আসামি করা হচ্ছে, যাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। ‘শিক্ষার্থী হত্যার দায়ে’ মামলা হয়েছে খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দীনের বিরুদ্ধেও।
ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির তথ্য মতে, ৫ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর থানাগুলোয় হত্যা মামলা হয়েছে ২৪৮টি।
অনুসন্ধান বলছে, মামলার বেশির ভাগ এজাহার একই ধরনের। এজাহারে থাকা ঠিকানার সূত্র ধরে আসামির খোঁজ করে জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা অভিযুক্ত ষাটোর্ধ্ব এই ব্যক্তি দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের একজন।
বিটোপি গ্রুপের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম আজাদ জানান, ‘বিজিএমইএ নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধেও এমন মামলা করা হয়েছে। অথচ যে অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে, সেই অপরাধটি সংঘটিত হওয়ার সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন।’
নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘এ ধরনের মামলার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিক বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ছেন, মালিক না থাকায় তাদের প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’
দেশের অন্যতম রপ্তানিনির্ভর গার্মেন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠান ফকির গ্রুপের এইচআর ও কমপ্ল্যায়েন্সের মহাব্যবস্থাপক সুমন কান্তি সিংহ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমাদের গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল, অথচ বিগত সরকারের আমলে তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাই ছিল না। এই মামলার ফলে বিদেশি ক্রেতারা আমাদের সততা, নিষ্ঠা নিইয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এতে আমাদের কম্পানিসহ দেশেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।’
এফবিসিসিআইয়ের আরেক সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, ‘একটি সুকৌশলী কুচক্রী মহল সমাজ ও অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই অশুভ গোষ্ঠীকে প্রতিহত ও পূর্ণশক্তি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে।’
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রবিরোধী একটি চক্র অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে ক্ষমতায় আসতে চায়। তারাই দেশের শিল্প-কারখানায় আক্রমণ করছে। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।’
১২৩২ কোটি টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি
মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০০৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত একটি গোয়েন্দা সংস্থা এবং টিএফআই কর্মকর্তারা প্রায় ৪০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক হাজার ২৩২ কোটি টাকা আদায় করেন। এই টাকা দুই শতাধিক পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের ০৯০০ নম্বর হিসাবে জমা হয়। জুলুম করে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি উঠেছে ব্যবসায়ী মহলে।
বর্তমানে ওই টাকা কী অবস্থায় আছে—জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা বলেন, টাকাগুলো কিভাবে আছে তা সরকার জানে। তবে চলতি হিসাবে টাকাগুলো জমা হওয়ায় এই টাকার কোনো সুদ হয়নি। টাকাগুলো সরকার ফেরত দেওয়ার চিন্তা করতে পারে বলে মত দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা।
ব্যবসায়ীদের ৬১৫ কোটি টাকা ফেরতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া ৬১৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকা তিন মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় ২০১৭ সালের ১৫ মে প্রকাশিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ওয়েবসাইটে।
তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত বলেছেন, কোন ক্ষমতাবলে এবং কিভাবে তারা টাকাগুলো উদ্ধার করে বা জোরপূর্বক নেয়, তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব ছিল সরকারের। সরকার নীরব থেকেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তার প্রধান নির্বাহী এই অনৈতিক ও অমানবিক কাজকে সমর্থন করেছেন।
অর্থ ফেরতের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যবসায়ীদের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম বলেন, ‘২০১৭ সালে আপিল বিভাগের রায়ের পর রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন পর্যন্ত সেই আবেদনের নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে ব্যবসায়ীরাও আর টাকা ফেরত পাননি।’
কবে নাগাদ আবেদনটির শুনানি হতে পারে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘যেকোনো সময় শুনানি হতে পারে। আমরা শুনানি করতে প্রস্তুত আছি।’
ব্যবসা থেকে রাজনীতিকে আলাদা করার পরামর্শ
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের (পিইবি) চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর রাজনীতি এই দুটি বিষয়কে আলাদা রাখতে হবে। কেউ অপরাধ করলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু ব্যবসার সার্বিক পরিবেশে যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে—সে জন্য অবশ্যই ব্যবসা পরিচালনার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুস্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। শুধু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে যেন কাউকে ভোগান্তি না পোহাতে হয়।’
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, শুধু রাজনৈতিক সমর্থন ছিল, কিন্তু কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না সে ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা যাবে না। তাতে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও উৎপাদন ব্যাহত হবে।
আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আপনারা এমন সমাজব্যবস্থা করেন যেখানে রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি না করলে ব্যবসা চালাতে পারবেন না, ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন না। রাজনীতিবিদরাই তো সমাজকে এই অবস্থায় নিয়ে গেছেন। এখন সব দোষ ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ীদের ওপর দিলে দেশের সমস্যার সমাধান হবে না। আমার তো মনে হয় আরো বাড়বে।’
এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘আমাদের ওয়ান-ইলেভেনের অভিজ্ঞতা ভালো না। সেই সময় ব্যবসায়ীদের জুলুম করে দেশের সংকট ত্বরান্বিত করা হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার একই ভুল করবে না বলে আমি আশা করি।’