|| চিররঞ্জন সরকার ||
খাতা-কলমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেও আদতে হোয়াইট হাউস চালাচ্ছেন ‘প্রেসিডেন্ট মাস্ক’। ট্রাম্প আসলে তার হাতের পুতুল। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই রব উঠেছিল। এখন শুধু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরাই নন, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরাও এমনটাই মনে করছেন। ট্রাম্পের নয়া জামানায় এই ধনকুবেরকে নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ বা ‘ডজ’-এর প্রধান হিসেবে ইলন মাস্ককে অসীম ক্ষমতা দিয়েছেন। মাস্কের এই অপরিমিত ক্ষমতা পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন বহু মানুষ। এমনকি এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪টি প্রদেশে মামলাও দায়ের হয়েছে। তবে সম্প্রতি মার্কিন আদালতে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘তিনি হোয়াইট হাউসের একজন কর্মচারী মাত্র। হোয়াইট হাউসের অন্য সিনিয়র উপদেষ্টাদের মতো ইলন মাস্কেরও নিজে থেকে কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তব বা আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নেই। তিনি কেবল প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিতে পারেন এবং তার নির্দেশাবলি ঘোষণা করতে পারেন।’
প্রসঙ্গত, সরকারি ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর জন্য এই ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি বা ডজ নামের এই নতুন দপ্তর তৈরি করেছেন ট্রাম্প। ২০২৪-এর নভেম্বরেই তিনি জানিয়েছিলেন, এই দপ্তরের মাথায় থাকবেন ইলন মাস্ক। কারণ তিনি নির্মমভাবে ছাঁটাই করতে পারেন। খরচ কমাতে মার্কিন প্রশাসন থেকে হাজার হাজার কর্মীকে ছেঁটে ফেলতে চান ট্রাম্প। দায়িত্ব পেয়ে ইলন মাস্ক শুধু কর্মচারী ছাঁটাইয়েই ভূমিকা পালন করছেন না, সব ব্যাপারেই মাথা ঘামাচ্ছেন। ট্রাম্পের চেয়েও বেশি তৎপরতা দেখাচ্ছেন। মাস্কের ভূমিকাই তাকে আলোচনার শীর্ষে নিয়ে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয় হোয়াইট হাউস। সেখানে প্রেসিডেন্টের জন্য রয়েছে বিশেষ একটি টেবিল ও চেয়ার। এই চেয়ারে বসেই তিনি দেশ শাসনের সিদ্ধান্ত নেন। এই টেবিলটি ‘রেজল্যুট ডেস্ক’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি এই ‘রেজল্যুট ডেস্ক’ নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে আমেরিকার প্রভাবশালী টাইম ম্যাগাজিন। তাদের সর্বশেষ সংস্করণের প্রচ্ছদে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের টেবিল ও চেয়ারে বসে আছেন ইলন মাস্ক। হাতে কফির কাপ, পেছনে আমেরিকা ও প্রেসিডেনশিয়াল পতাকা। টাইমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে, মাস্ক একমাত্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া আর কারও কাছে জবাবদিহির জন্য বাধ্য নন।’
এটি টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে মাস্কের দ্বিতীয় উপস্থিতি। গত নভেম্বরে মাস্কের ছবি দিয়ে শিরোনাম করা হয়েছিল, ‘নাগরিক মাস্ক : তার কাজের তালিকায় কী কী রয়েছে’। এই দুই প্রচ্ছদে ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে, ট্রাম্প নন, আসলে ক্ষমতায় রয়েছেন ইলন মাস্ক। ট্রাম্প অবশ্য এই প্রচ্ছদ নিয়ে মজা করে বলেছেন, ‘টাইম ম্যাগাজিন এখনও চালু আছে? জানতাম না তো!’ তিনি এটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্প কি আসলে মাস্ককে গ্রাস করছেন, না মাস্ক গ্রাস করছেন ট্রাম্পকে? এই প্রশ্নটা গত নভেম্বর থেকেই ঘোরাঘুরি করছে বিশ্বে। স্বাভাবিক। এভাবে কোনো প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীকে কোনো শিল্পপতি খোলাখুলি সমর্থন করেননি, এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যা করে দেখিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী মানুষ ইলন মাস্ক। রাজনীতির এমনই মহিমা, প্রত্যেক সফল নেতার পেছনে এক অদৃশ্য ছায়া থাকে। সেই ছায়া আসলে এক শিল্পপতির। আগে এই শিল্পপতিরা অনেকে আড়ালে থেকে সাহায্য করতেন; মিডিয়াকে প্রভাবিত করে, ভোট প্রচারে টাকা জুগিয়ে, রাজনীতিকদের সঙ্গে সামাজিক সংযোগ করে। এখন একেবারে খোলাখুলি। আমেরিকায় জন রকাফেলার কিংবা বিল গেটসের মতো শীর্ষ ধনীরা কখনও আসেননি প্রত্যক্ষ রাজনীতির বৃত্তে।
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকেই ট্রাম্পের কাছাকাছি দেখা গেছে টেসলা, স্পেসএক্স ও এক্সের মালিক ধনকুবের ইলন মাস্ককে। নির্বাচন ঘিরে ট্রাম্পের প্রচারের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থও ঢেলেছিলেন তিনি। এই আনুগত্যের পুরস্কার দিতে ভোলেননি ট্রাম্প। ক্ষমতা পাকা হওয়ার পর ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডজ) নামের নতুন একটি
বিভাগের দায়িত্ব দিয়েছেন মাস্ককে। এর উদ্দেশ্য কেন্দ্রীয় ব্যুরোক্রেসি মোটামুটি এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক বিষয়গুলো এবং কর্মক্ষমতার পূর্ণ নিরীক্ষণের মাধ্যমে কঠোর সংস্কারের সুপারিশ করবে সংস্থাটি, এমনটাই চাইছেন ট্রাম্প। দপ্তরটি চলবেও ওয়াশিংটনে মাস্কের স্পেসএক্স অফিস থেকে। ‘ডজ’কে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা। মাস্ক অবশ্য বলেছেন, ‘ডজ’ গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি নয়, হুমকি ব্যুরোক্রেসির জন্য। এই সংস্থার পরামর্শে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার কর্মী চাকরিচ্যুত হয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলন মাস্কে ভীষণ মুগ্ধ। সম্প্রতি নিজ মালিকানাধীন সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ইলন অসাধারণ কাজ করছে। তবে আমি চাই, সে আরও আগ্রাসীভাবে কাজ করুক। সবাই মনে রাখবেন, দেশ বাঁচানোর এক দায়িত্ব রয়েছে আমাদের। তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রকে যে কোনো সময়ের চেয়ে মহান করে তোলা।
বিষয়গুলোকে সহজ ভাবে দেখছেন না আমেরিকার নাগরিকরা। ট্রাম্প ও মাস্ক সম্পর্কে গুঞ্জন আরও বেড়েছে আমেরিকান মিডিয়ার সৌজন্যে। বেশ কিছু সংস্থা তাদের রিপোর্টে দাবি করেছে, মাস্ক আমেরিকার সম্ভাব্য রাষ্ট্রপ্রধান হতে চলেছেন। এরই মধ্যে ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ সংবাদপত্র মাস্কের জন্য একটি নতুন শব্দবন্ধ তৈরি করে ফেলেছেÑ ‘কো-প্রেসিডেন্ট’।
মাস্ক শুধু প্রযুক্তি ব্যবসায়ী নন, তিনি আমেরিকার রাজনীতিতেও একটি বিতর্কিত চরিত্র হয়ে উঠেছেন। তার কিছু কর্মকাণ্ড ও মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। যেমনÑ ট্রাম্পের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নাৎসি কায়দায় অভিবাদন (সিগ হেল) দেওয়া, মার্কিন উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএইডকে ‘অপরাধী সংগঠন’ আখ্যা দেওয়া ইত্যাদি। মাস্কের প্রভাবে আমেরিকায় শিশুদের ক্যানসার রিসার্চ ফান্ডের বরাদ্দ কমে গেছে। তিনি মার্কিন কংগ্রেসের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছেন।
ব্যক্তি-পূজার সংস্কৃতির শুরুটা করেছিলেন স্টিভ জবস। তিনি অতি সতর্কতা ও যত্নের সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে নিজের উদার ও কৌতূহলী উদ্ভাবকের ভাবমূর্তি ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে ‘কঠোর-নিয়ন্ত্রিত একটি কর্পোরেশনের’ প্রধান ছিলেন। জবস গোটা জীবন রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও তার আইকনিক অবস্থান অনুসরণ করে উঠে আসা উত্তরাধিকারীরা তার মূল্যবোধ ও আদর্শ মোটেও অনুসরণ করেননি। তারা তাদের নিজেদের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিজেদের উদ্যমকে রাজনীতির হাতে সঁপে দিয়েছেন এবং নিজেদের কায়েমি স্বার্থ উদ্ধারের এজেন্ডাগুলো উন্মোচিত করে দিয়েছেন। ইলন মাস্ক এর সর্বশেষ উদাহরণ।
মাস্কের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ শুধু আমেরিকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তিনি কট্টর ডানপন্থী ট্রাম্প ও তাঁর ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন) আন্দোলনকে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ব্রিটেনে তিনি কট্টর ডানপন্থী নেতা নাইজেল ফারাজকে সমর্থন জানিয়েছেন। জার্মানিতে তিনি চরম ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানিকে (এএফডি) প্রকাশ্যে সমর্থন করেছেন। এএফডি রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে এবং ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্ক দুর্বল করার পক্ষে। মাস্ক এএফডিকে জার্মানির ‘শেষ আশার আলো’ বলে উল্লেখ করেছেন।
ট্রাম্প ইউরোপে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যেখানে মাস্কও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছেন। মাস্ক আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেয়ির প্রশংসা করেছেন, যার কঠোর অর্থনৈতিক নীতি মাস্কের ‘ডজ’ নীতির অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে মাস্ক এল সালভাদরের বিতর্কিত নেতা নায়িব বুকেলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বুকেল কঠোর অপরাধ দমননীতি ও গণহারে লোকজনকে জেলে পাঠানোর জন্য পরিচিত। ট্রাম্প প্রশাসন আমেরিকার দণ্ডিত অপরাধীদের বুকেলের কারাগারে পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে।
মাস্কের প্রভাব শুধু আমেরিকা বা ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নেই। পোল্যান্ডে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ ভোটার মাস্ক সমর্থিত প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। মাস্কের বিশ্বজুড়ে ডানপন্থি বিপ্লবের প্রচেষ্টা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তবে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে তিনি অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। রীতিমতো বিশ্বরাজনীতির নয়া ‘অবতার’ হয়ে উঠেছেন তিনি!
গণতান্ত্রিক দেশগুলোর কপালে ভাঁজ ফেলছে একটিই শব্দ ‘মাস্কম্যানিয়া’। মাস্কের বিপুল বৈভব ও প্রভাবের সামনে কে লাগাম টানবে? ডলার যদি মিটার হতো, তাহলে মাস্কের টাকায় মঙ্গল গ্রহেও চলে যাওয়া যেত! মাস্কের এই উত্থান শুধু আমেরিকার রাজনীতিতে নয়, বিশ্বজুড়ে নতুন এক বিতর্কের সূচনা করেছে।
চিররঞ্জন সরকার : কলাম লেখক