|| ড. বি এম শহীদুল ইসলাম ||
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ সরাসরি কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। কৃষকগণ হাঁড়ভাঙা পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলায়। সে ফসল সারা দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পুরণ করে। কোনো কোনো কৃষি ফসল দেশের চাহিদা পুরণের পরবিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা হয়। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির অবদান অনস্বীকার্য।
অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির অবদান: বাংলাদেশের আর্থনৈতিক উন্নয়নে যে কয়টি সেক্টর কাজ করছে তার মধ্যে কৃষি সেক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছ। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে কৃষি। খাদ্য সরবরাহ, আমিষের ঘাটতি পুরণ ও পুষ্টি চাহিদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কৃষক ও কৃষি সম্পদ। আমাদের কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ঘাটতি পুরাণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু এ খাতে পর্যাপ্ত বাজেট না থাকার কারণে কৃষকগণ ফসল উৎপাদনে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন। এমতাবস্থায় কৃষি খাতে সরকারের অরো উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও সহযোগিতামূলক হাত বাড়ানো খুবই জরুরি।
কৃষি বলতে শুধু ধান, পাট, আলু, পটল, সরিষা, ভুট্টা আর শালগম উৎপাদনের চাষ করাকে বুঝায় না। বরং কৃষির সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় উদ্যোগকে কৃষি কাজ বলা হয়। আমাদের দেশের কৃষি জমি বিশেষভাবে উর্বর। তাই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি আমাদের দেশের কৃষকগণ বর্তমানে গরু পালন, মুরগী পালন, হাঁস পালন, মাছের চাষসহ নানা ধরণের কৃষি কাজের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে-কৃষিকে সম্প্রসারণ করা এবং একাধিক উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য চাহিদা মিটানোর পর বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। অন্যদিকে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথকে সুগম করা। আমাদের দেশের অনেক যুবক এসব কৃষি ক্ষেত্রে নিজেদের কর্মসংস্থানের সুযোগ গ্রহণ করছেন। বাংলাদেশে কৃষির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে-একমাত্র কৃষিক্ষেত্রেই অপেক্ষাকৃত কম পুঁজিতে বড় উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে অনেকেই চাকরির চিন্তা না করে কৃষি কাজের মাধ্যমে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টায় নিমজ্জিত।
এছাড়া কৃষি কাজ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বহুমুখী উৎপাদনশীল ব্যক্তি মালিকানা ও সরকারি কৃষি খামারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান। গড়ে উঠেছে খাদ্যপণ্য এবং কৃষিজ উৎপাদন সহায়ক উপকরণের ছোট-বড় ব্যবসা। কৃষি বীজের ব্যবসা, সারের ব্যবসা, কীটনাশক ঔষধের ব্যবসা ইত্যাদি। কেননা কৃষি সেক্টরটি বর্তমানে জাতীয় উন্নয়নে বহুমুখী কর্মক্ষেত্রের বৃহৎ সমাবেশ ঘটিয়ে শুধু উৎপাদনের ওপর ভরসা না করে কৃষি থেকে কৃষি শিল্পের দিকে সম্প্রসারণ হচ্ছে। কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত বিকাশের প্রতি বাংলাদেশের কৃষকগণ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। ধান ও পাট চাষের প্যারালাল ফুল, ফল, শাক-সবজি ও অন্যান্য ফসল, মাছ, মুরগি, দুধ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠছে পৃথক পৃথক শিল্প খাত। এছাড়া বাঁশের দ্বারা ঝুড়ি তৈরি, ফসল রাখার গোলা তৈরি, বেত দ্বারা নিত্য নতুন জিনিস তৈরির মাধ্যমে বাড়ি ও দোকান-পাটের সৌন্দর্য বর্ধনসহ নানা শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পের মধ্যে রয়েছে পোলট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, মৎস হিমায়িতকরণ ও প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। কৃষিজ শিল্প খাতের মধ্যে খাদ্য ও কাঁচা মাল সংরক্ষণের প্রক্রিয়াজাত শিল্প অন্যতম। আমরা জানি, প্রকৃতিগতভাবেই আমাদের খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প বহুমুখী একটি ক্ষেত্র। দেশে প্রায় আটশত প্রক্রিয়াকরণ খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সময়ের পরিবর্তন ও জাগতিক উন্নয়নের সাথে সাথে কৃষির উন্নয়নেও এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির দ্রুতগতির সঙ্গে সীমিত ও সংকুচিত হয়ে আসা জমি নিয়েও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার ও আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ। এর অসাধারণ অবদান রয়েছে আমাদের দেশের গবেষক ও কৃষি বিজ্ঞানীদের। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিষ্ঠার সাথে গবেষণার কারণে উচ্চফলনশীল ফসল অথচ অতি স্বল্পতম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশ সহিষ্ণু নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন করেছেন।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকদের বড় ধরণের ক্ষতি হচ্ছে। তারপরও কৃষকরা এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ২০২৪ সালের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিধায় কৃষকগণ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কোনো প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আরো উন্নত মানের ধান চাষের মাধ্যমে বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিশ্বে সুখ্যাতি পাবে বলে আমার ধারণা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের প্রায় ৫৮ শতাংশ চাল আসে বোরো ধান থেকে। বোরো ফসলের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রায় ২০ শতাংশ চাষের জমি কমলেও চাল উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচ গুণ। আমাদের দেশের বহু কৃষিজ ফসল ও পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
অপরপক্ষে ইরি চাষের সময় যে ফসল কৃষকরা ঘরে তোলে তাতে খাদ্য চাহিদা মিটানোর পর অতিরিক্ত ফসল বিক্রি করে কৃষকগণ আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পান। ধান কাটার পর বিচুলি বিক্রি করে আমাদের দেশের কৃষকেরা প্রতি সিজনে বিঘা প্রতি প্রায় দশ হাজার টাকা আয় করে থাকেন।আমাদের দেশের নাগামরিচ, হবিগঞ্জের লেবু, কচুর লতি, উত্তরবঙ্গের সজিনার ডাটা উৎপাদন কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখছে। এসব কৃষিদ্রব্য বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়। তাছাড়া খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে ঘেরের মাধ্যমে চিংড়ি মাছ ও কাঁকড়ার চাষ করে কৃষকগণ বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক অর্থ উপার্জন করছেন। কিন্তু স্বল্প পুঁজির কৃষকগণ কৃষি উৎপাদনের দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির কারণে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। অর্থের অভাবে খরা মৌসুমে সময় মতো জমিতে পানি সেচের ব্যবস্থা করতে না পারা এবং যথাসময়ে সার ও কীটনাশক ঔষধ দিতে না পারার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং কৃষির মাধমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া কৃষি সামগ্রীর দাম দিন দিন বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এমতাবস্থায় সরকারকে কৃষি সরঞ্জামাদির মূল্য কমানো, শস্য উৎপাদনে কৃষকদের উৎসাহ প্রদান ও কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য কৃষকদের বিনা সুদে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করলে কৃষকরা যেমন উপকৃত হবে, তেমনি কৃষির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে কৃষকগণ অসামান্য অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট।